আন্তর্জাতিক

ইরানের পাঁচ তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলা, রুবিওর হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, : গত দুই দিনে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে দেশটির পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে চারটি এবং খার্গ দ্বীপের কাছে একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের দাবি, ট্যাংকারগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ‘বহু বিলিয়ন ডলারের একটি ছায়া নেটওয়ার্কের অংশ’, যা আইআরজিসি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন করে। হামলার আগে পাঁচটি জাহাজের ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
কলম্বিয়া সফরকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানগুলোতে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যতবার এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবারই তারা ট্যাংকার হারাবে। আজও এর পুনরাবৃত্তি দেখতে পারেন।”
রুবিওর এই বক্তব্য এমন সময় এল, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। গত শনিবারও ইরানের দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছিল।
সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার একটি লক্ষ্য ছিল খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা ইরানি ট্যাংকার। ইরানের প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টার্মিনাল এই দ্বীপে অবস্থিত। দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই টার্মিনালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে খার্গ দ্বীপের আশপাশে হামলা ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাবে ইরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ভূপাতিত করেছে। দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।
এর আগে ইরান দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালিতে তারা একটি চালকবিহীন মার্কিন সাবমেরিন জব্দ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সেটি ছিল একটি পুরোনো মডেলের পানির নিচের ড্রোন, যা এক দিনেরও বেশি সময় আগে ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়ে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ড্রোনটি আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণ ও চলমান অভিযানে সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা ছিল না এবং শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না।
এর মধ্যেই ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এতে ৭৩ জন আহত হয়েছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, হামলায় কয়েকটি তেল স্থাপনা ও অবকাঠামোয় আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে কয়েকটি স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
হুথিদের এই হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়। আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে এই পথে জাহাজ চলাচলও কমে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও দীর্ঘ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ক্রুদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, এসব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ফলে একদিকে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুমকি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *