কৃষি

কীটনাশক কোম্পানির ‘ইচ্ছামতো’ দামে দিশাহারা কৃষক: নিয়ন্ত্রণে নেই নীতিমালার প্রয়োগ

বিশেষ প্রতিনিধি:
চলমান দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকরা। সারের পর এবার কীটনাশক ও বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের কৃষি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত দুই বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে বেশিরভাগ বালাইনাশকের দাম গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি কোনো কোনো জরুরি পণ্যের দাম মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কয়েক দফায় বেড়ে দ্বিগুণেও ঠেকেছে। বিক্রেতা ও কৃষি কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, বাজারে সরকারি নজরদারি না থাকায় ওষুধ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে।
লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বালাইনাশকের দাম
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান কৃষ্যাঞ্চল যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, বহুল ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও আগাছানাশকের দামই ঊর্ধ্বমুখী।
থিয়োভিট: সার, ছত্রাকনাশক ও মাকড়নাশক হিসেবে ব্যবহৃত থিয়োভিটের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আগে যে পণ্যটি কেজিপ্রতি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে তার দাম গিয়ে ঠেকেছে ৩০০ টাকায়।
প্যারাকোয়াট: আগাছানাশক প্যারাকোয়াটের ২০ লিটারের একটি ড্রামের দাম চার হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ছয় হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।
অন্যান্য বালাইনাশক: ছত্রাকনাশক মাইক্রোথিয়ার কেজি ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯৫ টাকা হয়েছে। ম্যানসার (১০০ মিলি ২০০ টাকা, ৫০০ মিলি ৯০০ টাকা) ও কীটনাশক মর্টারের দাম ৬ মাসে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জৈব উজ্জীবক লিটোসেন, সেলটিমার, নুট্রাফস এবং কীটনাশক মার্শালের (৮৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৯৮৫ টাকা) দামও বাড়তি।

কৃষক ও বিক্রেতাদের জিম্মি দশা
মাঠপর্যায়ের কৃষকরা জানান, মূলধন সংকটের কারণে তাদের বেশিরভাগ সময়ই স্থানীয় দোকান থেকে বাকিতে কীটনাশক কিনতে হয়। ফলে বিক্রেতা যে দাম দাবি করেন, তাতেই পণ্য নিতে বাধ্য হন তারা। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা কেবল কোম্পানির নির্ধারিত দামে ডিলারদের কাছ থেকে মালামাল এনে বিক্রি করেন। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি অনেক সময় ছয় মাসের মধ্যে একটি পণ্যের দাম তিনবার পর্যন্ত বাড়ানো হলেও তার পেছনের কারণ সম্পর্কে বিক্রেতারাও কিছু জানতে পারেন না।

অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ও নীতিমালা প্রয়োগের দাবি
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি উপকরণের ওপর নানা ধরণের শুল্কছাড় সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও কীটনাশকের লাগামহীন দাম বাড়ছে। এছাড়া মাঠে পরামর্শের অভাবে কোম্পানি প্রতিনিধি ও দোকানদারদের উসকানিতে কৃষকরা প্রায়শই অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন, যা তাদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কীটনাশক ও বালাইনাশকের উৎপাদন ব্যয় এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নিয়ন্ত্রণে সরকারের দ্রুত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা উচিত, যাতে কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য বন্ধ করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *