ইলিশের দেশে ভারতীয় ইলিশের সয়লাব: নেপথ্যে উৎপাদন সংকট ও আকাশচুম্বী দাম
বেনাপোল: একসময় বিশ্ববাজারে ইলিশ রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশেই এখন দেদারসে বিকোচ্ছে ভারতীয় ইলিশ। স্থানীয় বাজারে ইলিশের তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী দামের সুযোগে সীমান্ত পেরিয়ে আসছে হাজার হাজার টন আমদানিকৃত মাছ। কাস্টমস ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কেবল বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েই গত দুই মাসে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের ৩৫০ টনেরও বেশি (৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি) ভারতীয় ইলিশ দেশে প্রবেশ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, বাস্তবে এই রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন। আমদানিকৃত এই মাছের বড় একটি অংশ আসছে ভারতের গুজরাট উপকূল থেকে।
আমদানির পেছনে বড় মুনাফা ও আন্তর্জাতিক চাহিদা
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ভারতে প্রতি কেজি ইলিশের কেনাদাম পড়ে সর্বোচ্চ দুই ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকা। প্রয়োজনীয় শুল্ক ও পরিবহন খরচ যোগ হলেও দেশে পৌঁছে এই ইলিশের বিক্রয়মূল্য দেশীয় বাজারদরের তুলনায় অনেক কম থাকে। ফলে আমদানিকারক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দুই দিক থেকেই মোটা অঙ্কের মুনাফা গুণছেন।
এছাড়া গুজরাটের ইলিশ আকারে বড় এবং ডিমে ভরা হওয়ায় স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এর ডিম প্রক্রিয়াজাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও রপ্তানি করা হচ্ছে।
কেন এই করুণ দশা দেশীয় ইলিশের?
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে দেশের জলসীমায় ইলিশের বিচরণ ও জোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
নদ-নদীর প্রজনন ও মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
অব্যাহত নদীদূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন
নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ঘের জালের অবাধ ব্যবহার
মৎস্য অধিদপ্তরের উপাত্ত বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫ লাখ ৪ হাজার টনে। জোগান কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান বাজারে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সর্বকালের রেকর্ড গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ২,৮০০ টাকায়।
অধিদপ্তরের বক্তব্য ও প্রকল্প তদন্ত
বাজারের ঘাটতি মেটাতে ও সাধারণের নাগালের মধ্যে ইলিশ পৌঁছাতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক। তিনি বলেন, “দেশীয় বাজারে জোগান কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সাগরে আমাদের মজুত হ্রাস পাওয়ায় সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে অতীতে গৃহীত ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম ছিল কি না, তাও এখন কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
