অর্থনীতিসারাদেশ

পদ্মার বিচ্ছিন্ন চরে নাগরিক দুর্ভোগের চরম রূপ: ‘নামে মাত্র’ কুষ্টিয়ার চরসাদিপুর ইউনিয়ন

কুষ্টিয়া: 
পদ্মা নদীর উত্তাল তরঙ্গ আর বিস্তীর্ণ ধূ-ধূ বালুচরের ওপারে গড়ে ওঠা এক বিচ্ছিন্ন জনপদের নাম চরসাদিপুর। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আওতাধীন ২৫ বর্গমাইলের এই ইউনিয়নে বাস করেন প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার মানুষ। কিন্তু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের বাসিন্দাদের দিন কাটছে চরম দুর্ভোগ ও হতাশায়। স্বাধীনতার এত বছর পরও মৌলিক নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত এই জনপদের মানুষের কাছে স্থানীয় সরকার বলতে যেন শুধুই একটি ‘নামকওয়ালা’ সাইনবোর্ড।
জেলা শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার এবং উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জনপদে পৌঁছানোই এক বিশাল যুদ্ধ। বর্ষাকালে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা, আর শুষ্ক মৌসুমে চোখধাঁধানো মাইলের পর মাইল বালুচর। উপজেলা বা জেলা শহরে পৌঁছাতে ঘাটে এসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা, নৌকা পার হয়ে কাদা-বালু পেরিয়ে আবার যানবাহনের সন্ধান করা—সব মিলিয়ে যাতায়াতেই পার হয়ে যায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। জরুরি চিকিৎসা বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে সময়মতো পৌঁছানো সেখানে এক অসম্ভব বাস্তবতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চরসাদিপুর একসময় পাশের পাবনা জেলার সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৯৮ সালে এটিকে কুষ্টিয়ার ইউনিয়ন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে প্রশাসনিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হলেও আজ অবধি অন্য ৮টি সাধারণ ইউনিয়নের মতো প্রয়োজনীয় সরকারি অবকাঠামো এখানে গড়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন কেনাকাটা ও প্রয়োজনীয় জরুরি প্রয়োজনে এখানকার বাসিন্দারা এখনও পাবনা জেলার ওপরই নির্ভরশীল।
ইউনিয়নে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক বা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নেই। ফলে কোটি টাকার সরকারি ভবনটি অকেজো পড়ে আছে এবং রোগীরা ন্যূনতম সেবাও পাচ্ছেন না।
পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা হওয়ায় এলাকাটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এলাকায় কোনো পুলিশ ক্যাম্প নেই। পদ্মার দুর্গম পথ পার হয়ে পুলিশও মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, যার সুযোগে অঞ্চলটি মাদকে সয়লাব হয়ে পড়েছে।
২৪ হাজারের বেশি জনসংখ্যার এই ইউনিয়নে নেই কোনো ভূমি (তহশিল) অফিস, পোস্ট অফিস কিংবা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকিং সুবিধা। জমির অতি সামান্য কাগজপত্র বা দাপ্তরিক কাজের জন্যও সাধারণ মানুষকে পুরো দিন ব্যয় করে নদী পার হয়ে কুষ্টিয়া বা কুমারখালী ছুটতে হয়।
চরসাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মেছের আলী খাঁন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, একটি ইউনিয়নের স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য সর্বনিম্ন যে অবকাঠামো দরকার, তাও এখানে নেই। তহশিল অফিস ও পোস্ট অফিসের মতো জরুরি দপ্তরগুলো দ্রুত স্থাপন করা না হলে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও মানুষকে সঠিক সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার জানান, ভৌগোলিক জটিলতা সত্ত্বেও এলাকায় কিছু উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। ইউনিয়নের নাগরিকদের দাপ্তরিক ও মৌলিক সেবা বৃদ্ধি করতে আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পদ্মা নদী ও বিস্তৃত চরের ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকা চরসাদিপুরের বাসিন্দাদের একটাই দাবি—কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনেও যেন তারা অন্য আটদশটি ইউনিয়নের মতো পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সুবিধা ও সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখতে পান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *