জাতীয়সারাদেশ

সতীনকে ‘বড় মা’ ও নিজেকে ‘আন্টি’ ডাকায় ফুটফুটে শিশুকে পেটে চাকু বসিয়ে দিল জন্মদাত্রী মা

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি :
‘মা’ শব্দের চেয়ে মিষ্টি কোনো ডাক পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সেই ডাকটিই যে একটি অবুঝ ৩ বছরের শিশুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি! নিজের জন্মদাত্রীকে ‘আন্টি’ আর সতীনকে ‘বড় মা’ বলে ডাকায় ক্ষোভে ও ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে ৩ বছরের শিশুসন্তান আশরাফুলকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে জন্মদাত্রী মা আকলিমা বেগমের (৩৫) বিরুদ্ধে।
এখানেই শেষ নয়, আশরাফুলকে হত্যার পর আকলিমা তার ৮ বছর বয়সি কন্যাশিশু সিদরাতুলকেও ছুরিকাঘাতে হত্যার চেষ্টা চালান। পরে তিনি নিজে আত্মহত্যা করার নাটকীয় চেষ্টা চালান বলে পরিবার সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দিবাগত গভীর রাতে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের খালিয়ার বাইদ (মুজিবনগর মোড়) এলাকায় ঘটে যায় এই লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনা। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে অভিযুক্ত ঘাতক মা আকলিমাকে হেফাজতে নিয়েছে সখীপুর থানা-পুলিশ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সখীপুরের শাহিন মিয়ার প্রথম স্ত্রী নাসিমা আক্তারের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। তাই সংসার ও বংশ রক্ষার তাগিদে তিনি চার বছরের একটি কন্যাসন্তানসহ আকলিমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিয়ের পর আকলিমার ঘরে জন্ম নেয় আশরাফুল। তবে শিশু আশরাফুলের বয়স যখন মাত্র ৪০ দিন, তখন তাকে সতীনের কাছে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চলে যান আকলিমা।

মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত শিশু আশরাফুল বড় হতে থাকে সৎ মা নাসিমার কোলেই। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই সে নাসিমাকে ‘বড় মা’ বলে ডাকত এবং দীর্ঘদিন দূরে থাকা নিজের আসল মা আকলিমাকে ডাকত ‘আন্টি’। নিজের জন্ম দেওয়া সন্তান অন্য নারীকে ‘মা’ ডাকছে আর তাকে পর ভাবছে—এই তীব্র হিংসা ও মানসিক যন্ত্রণা থেকেই মা আকলিমা এই নৃশংস পথ বেছে নেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

বুধবার গভীর রাতে যখন পুরো বাড়ি নিঝুম ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আকলিমা ঘরে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে ঘুমন্ত আশরাফুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবুঝ শিশুটির আর্তচিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আকলিমার ৮ বছরের মেয়ে সিদরাতুলও ছুরিকাঘাতে আহত হয়। রক্তাক্ত আশরাফুলকে উদ্ধার করে দ্রুত পার্শ্ববর্তী ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পরপরই আকলিমা নিজেকে রক্ষা করতে বা অপরাধ ঢাকতে আত্মহত্যার অভিনয়/চেষ্টা করেন। কিন্তু টের পেয়ে ঘরের বাইরে এসে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা ও স্বজনেরা তাকে আকলিমাকে আটক করে বাড়ির উঠানে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুরাদ হোসেন জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ঘটনাস্থল সখীপুর ও ভালুকা থানার মধ্যবর্তী সীমানায়। শিশুটির মরদেহ বর্তমানে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও চিকিৎসার স্বার্থে ঘাতক মাকে সখীপুর থানা-পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অবুঝ শিশু আশরাফুলের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *